ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
ঈদের পর কমেছে সবজি ও মুরগির দাম ভোটের মাধ্যমে সংসদে যেতে চান সারজিস হবিগঞ্জে ছাত্রদল-যুবদলের সংঘর্ষে আহত ২০ গাইবান্ধায় মাদকসহ মহিলা দল নেত্রী গ্রেফতার দক্ষিণ এশিয়ার ইসরায়েল ভারত চট্টগ্রামে বিএনপি নেতার মায়ের জানাজা শেষে দুই পক্ষের সংঘর্ষ প্রয়োজনে জোটগতভাবে নির্বাচন করবে এনসিপিÑ আতিক মুজাহিদ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড়

গণপূর্ত অধিদফতরে কমিশন বাণিজ্য

  • আপলোড সময় : ১১-১১-২০২৪ ০৫:২৯:২১ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১১-১১-২০২৪ ০৫:২৯:২১ অপরাহ্ন
গণপূর্ত অধিদফতরে কমিশন বাণিজ্য

* কমিশন বাণিজ্যে হাওয়া ১১ হাজার কোটি টাকা
* ঠিকাদার-প্রকৌশলীরা গোপনে আঁতাত করলে কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারবে না
 

গণপূর্ত অধিদফতরে ওপেন সিক্রেট চলছে কমিশন বাণিজ্য। কাজের বিপরীতে উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে গণপূর্ত অধিদফতরের কমিশন বাণিজ্যও চলছে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে মন্ত্রী, সচিব, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন ধাপে উন্নয়ন কাজে বিলের প্রায় ৮ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বিলের ৩২ শতাংশ কমিশন গুনতে হয়। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থাৎ ৬ অর্থবছরে এই হারে কমিশনে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা হাওয়া হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার জানিয়েছেন, ঠিকাদার-প্রকৌশলীরা গোপনে আঁতাত করে কিছু করলে সেটা তো কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারবে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত ছয় অর্থবছরে গণপূর্ত অধিদফতরে উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণ খাতে খরচ হয়েছে ৫৫ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। গণপূর্তের নিজস্ব উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি ডিপোজিট ওয়ার্ক হিসাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণলায়, দফতর ও সংস্থার কাজ বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া সরকারি অফিস ও মন্ত্রী-সচিব এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টারের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেবা নিশ্চিতেও বিপুল অর্থ খরচ হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অধিদফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং সচিবরাও নিয়েছে কমিশন। আরো জানা গেছে , গণপূর্তের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে প্রায় ৮ শতাংশ কমিশন দিতে হয় ১১ জায়গায়, সেই ভাগ্যবানদের তালিকায় রয়েছে-দরপত্র আহ্বানকারী নির্বাহী প্রকৌশলী ১ শতাংশ, প্রধান প্রকৌশলী ১ শতাংশ, মন্ত্রণালয়ের সচিব ১ শতাংশ, মন্ত্রী ১ শতাংশ এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের ১ শতাংশ। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, কার্যসহকারী ও হিসাব সহকারী এবং অন্যান্য খাতে আধা শতাংশ করে প্রায় ৩ শতাংশ কমিশন গুনতে হয়। সংশ্লিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, গণপূর্তের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ১১ জায়গায় কমিশন বাণিজ্যে চলে যাচ্ছে প্রায় ৩২ শতাংশ টাকা।
ওই ভাগ্যবানদের তালিকায় রয়েছেন-কার্যসহকারী ১ শতাংশ, উপসহকারী প্রকৌশলী ৫ শতাংশ, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ৫ শতাংশ, নির্বাহী প্রকৌশলী ১০ শতাংশ, সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ৩ শতাংশ, সার্কেলের স্টাফ অফিসার ২ শতাংশ, জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ২ শতাংশ এবং জোনের অন্যান্য কর্মচারী ২ শতাংশ, জোনের উপহিসাবরক্ষক (ডিএ) ১ শতাংশ, হিসাব সহকারী এবং অন্যান্য খাতে ১ শতাংশ। অর্থাৎ গণপূর্ত অধিদফতরের প্রকল্প ও রক্ষণাবেক্ষণ দুটি কাজের মোট কমিশন বাণিজ্যের যোগফল দাঁড়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ, যার গড় পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ। গণপূর্তের ঠিকাদার, বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্য থেকে প্রায় ২৫ জনের সঙ্গে কথা বলে কমিশন বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর এমন চিত্র বেরিয়ে এসেছে। তাদের দৃঢ় অভিমত, অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র এর চেয়ে বেশি ছাড়া কোনো অংশে কম নয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) মতো সংস্থাগুলোকে এই সংস্থার দুর্নীতির চিত্রগুলো খতিয়ে দেখা উচত বলে মনে করেন তারা।
কয়েকজন প্রকৌশলী জানান, গণপূর্তের নির্মাণকাজের মানের সুনাম রয়েছে। কেননা কাজগুলোর যথাযথ মান নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। তাছাড়া গণপূর্তের প্রকৌশলীরা দেশের সেরা। এজন্য প্রকল্পের কাজে লোপাট রক্ষণাবেক্ষণ কাজের চেয়ে কিছুটা কম। তবে এটাও সত্য যে, প্রকল্পের আকারও অনেক বেশি হয়ে থাকে। আর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কমিশনও বেশি। কেননা এখানে কাজের প্রাক্কলন করা হয় বাস্তব মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি। এর মধ্যে এক অংশ দিয়ে কাজ হয়। বাকি একাংশ কমিশনে চলে যায় এবং অবশিষ্ট অংশ ঠিকাদারের লাভ এবং ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ খরচ হয়।
তারা বলেন, অর্থবছরের শুরুতে গণপূর্ত থেকে ভবন ও স্থাপনার মূল্যের ২ শতাংশ হারে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রস্তাব করা হয়। যার আকার দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে সরকার বছরভেদে ১ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বরাদ্দ দেয়। সেটারও দুই ভাগ হাওয়া করে দেয় প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকারদারচক্র।
গণপূর্ত অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৩৭টি মন্ত্রণালয় ও দফতরের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৭ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা খরচ করেছে গণপূর্ত অধিদফতর। একইভাবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের ৩৬টি মন্ত্রণালয় ও দফতরের কাজে খরচ হয়েছে ৭ হাজার ৯৫ কোটি টাকা, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ৩৭টি মন্ত্রণালয়, দফতর ও বিভাগে খরচ হয়েছে ৬ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৩৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজে খরচ হয়েছে ৮ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৩৭টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরের কাজে খরচ হয়েছে ৯ হাজার ২৪১ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৩২টি মন্ত্রণালয়, দফতর ও বিভাগের কাজে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা।
আরও জানা যায়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। অন্যতম কাজের মধ্যে রয়েছে-ভবন নির্মাণ, পার্ক বা উদ্যান নির্মাণ, অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ, অফিস বা ভবনের সব ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজ। এছাড়া সরকারি প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ, ভূমি সার্ভে, সয়েল টেস্ট, স্ট্রাকচারাল ডিজাইনসহ প্রভৃতি কাজ করে থাকে। এসব কাজ বাবদ সরকার গণপূর্তকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। প্রায় ২০০ বছর ধরে গণপূর্ত অধিদফতর এ অঞ্চলের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ভূমিকা রেখে চলেছে। শুরু থেকেই কমিশন বাণিজ্যের রীতি ছিল, যা সময়ের ব্যবধানে রূপ বদল করে পরিমাণে বেড়েছে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক সচিব জানান, গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর মাঠ পর্যায়ের কাজের তেমন অভিজ্ঞতা নেই। বিভিন্ন ধরনের অফিশিয়াল কাজ করেছেন। এজন্য গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পেলেও তা যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। প্রকল্প বাস্তবায়ন, কাজের মান সংরক্ষণ এবং অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। তবে নিজে ঘুস বা দুর্নীতি করেন না বলে দাবি করে থাকেন। সেটা সত্য ধরে নিলেও তিনি চরমভাবে ব্যর্থ। গণপূর্তের চরম বিশৃঙ্খলা এবং ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় তিনি কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স